আতিথেয়তার অতিরেক

in BDCommunity16 days ago

আমরা বাঙ্গালিরা মেহামানদারি করতে খুব পছন্দ করি। বাসায় কোন অতিথি আসলে তাকে ভালো মন্দ খাওয়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। অনেক সময় একটু বেশিই ভাল খাওয়াতে গিয়ে গেস্টকে কম সময় দিয়ে রান্নায় বেশি দিয়ে দেই। ফলে দেখা যায় তাদের বসিয়ে রেখে হোস্ট রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয় থাকতে পারে যেমন যারা গল্প করতে তেমন পছন্দ করে না, introvert, বা অতিথি ভোজনরসিক, গল্প করার থেকে খেতে বেশি পছন্দ করে। আবার ঘুরে আসার পর বাসার মানুষরা জিজ্ঞেসা করে কি রান্না করে খাওয়ালো? এমন কেস হলে আলাদা কথা। কিন্তু সমবয়সী কাছের বন্ধু গোছের মানুষজন হলে যদি বেশিরভাগ সময়টা রান্নায় চলে যায় তাহলে তা আফসোসের বিষয়।

IMG_20231023_145000.jpg

আমাকেই উদাহরণ হিসেবে দেই। পরিবারে আম্মু, নানি, চাচি, ভাবি সবাইকেই দেখেছি বাসায় কেউ আসলে কি খাওয়াবো ওইটাই মুখ্য হয়ে যায়। এটা ওটা রান্না করতে করতে রান্নাঘরেই দিন পার। মেহামানের সাথে বসে দুই চারটা সুখ দুখের যে আলাপ করবে সেটার সময়টা খুব অল্প হয়ে যায়। অনেক সময় গল্প করার সুযোগও হয় না। মেহামান যাওয়ার পর কাজের চাপে শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ার যোগান!

এই বয়সে এসে আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয়, নানি চাচিদের কি এই রান্নার প্রেসার ভালো লাগতো? মন ভরে আড্ডা না দিতে পারলে কষ্ট লাগতো না? নাকি পেট ভরে খাওয়াতে পারলাম এটাতেই শান্তি পেতো। নিজে রান্না করে খাওয়ানোতে তো আসলেই শান্তি, কিন্তু সব ছেড়ে যদি খাওয়ানোতেই মূল ফোকাস চলে যায় তাহলে কি পরে খারাপ লাগে না?

এত কথা বলার কারণ এখন এই জিনিস আমি নিজে ফেইস করছি। নিজের বাসা হয়েছে। বাসায় গেস্ট আসলে আমিই হোস্ট। আমার পারমানেন্ট হেল্পিং হ্যান্ড নাই। বাবু নিয়ে একলাই সব সামাল দিতে হয়। অফিস শেষে রাতে ত্বহা আসলে ও যতটুকু পারে সব গুছায় দেয়। এরপরেও দেখা যায় গেস্টের জন্য খাবার সামলাতে গিয়ে গল্প করার সুযোগ কমে যায়। আবার গেস্ট আসার আগে রান্না করে বেশি রেখেও দিতে পারিনা কারণ বাসায় বাবুকে দেখার কেউ নাই। সারা সপ্তাহের রান্না উইকেন্ডে করে ফ্রিজে রেখে দিতে হয়।

IMG_20231002_223021.jpg

আমি আড্ডাপ্রেমি মানুষ। বাসায় কেউ আসবে শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়। গল্প করতে পারবো বলে। কিন্তু পারিবারিক ভাবে দেখে শিখে আসায় মনের মধ্যে ওই ইচ্ছাটা রয়েই যায় যে ভালো কিছু না খাওয়ালে খারাপ দেখায়। তাই রান্নাঘরে থাকলেও মন পড়ে থাকে ড্রইংরুমে। কান খাড়া করে শুনি ওরা কি বলে।

এবার বাসায় আমার দুই বোন আসলো। তেমন স্পেশাল কিছু না। বেসিক রান্না করেই খাওয়ালাম কিন্তু ওরা যাওয়ার পর মনটা এত খারাপ হয়ে ছিল। একটু সময় নিয়ে ভাল মন্দ আলাপ করতে পারলাম না। যাওয়ার সময় বোনটা রাগ করে বলেই গেলো - "তোমার বাসায় কি আমরা খাওয়ার জন্য আসি?"

কথাটা আমাকে আসলেই খুব ভাবিয়েছে। এজন্য এখন ঠিক করে রেখেছি, যারা আমাকে দেখার জন্য শুধুমাত্র আসে তাদের জন্য সুযোগ পেলে আগেই রান্না করে রেখে দিবো। না হলে বাসায় যা থাকবে তাই খাওয়াবো। একটু কথা বলতে পারলাম না এই আফসোস যাতে পরে না করতে হয়৷

IMG_20231023_180753.jpg

মেহামানদারির কষ্ট সমাধানের জন্য অনেক উপায় আছে। যেমন কারও বাসায় গেলে মিষ্টি না কিনে একটা ডিশ রান্না করে নিয়ে যাওয়া। যাতে হোস্টের উপর প্রেসার কম পড়ে। আবার খাওয়া শেষে হোস্টকে গুছাতে হেল্প করা, প্লেট ধুয়ে দেয়া। এসব জিনিসকে নরমালাইজ করা উচিত। মেহামান থালা বাসন ধুয়ে দিলে মান সম্মান যাবে এসব আইডিয়া থেকে বের হয়ে আসা।

আবার অনেকে বাসায় হোম মেইড ফ্রোজেন ফুড বানিয়ে রেখে দেয়। এটাও একটা ভাল অপশন। চট জলদি করে বের করে নাশতা দিয়ে দেয়া যায়। কম সময়ে বেটার ফুড।

IMG_20251110_142511.jpg

সবশেষে বাসায় রান্না যদি পসিবল না হয় তাহলে বাড়তি চাপ না নিয়ে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসা। এতে করে কোয়ালিটি টাইমও কাটানো হবে আবার শরীরের ধকলও কমবে।

আমরা ফ্রেন্ডরা একসাথে হলে ওয়ান ডিশ পার্টির আয়োজন করতাম। এতে সবাই একটা করে ডিশ রান্না করে আনতো। যে রান্না পারে না সে সালাড, ফ্রুট বা সফট ড্রিংন্স নিয়ে আসতো।

আমাদের উচিত এসবগুলো বিষয়কেই নরমালাইজ করা। নিজের মেন্টাল এবং ফিজিকাল দুইটাকেই প্রাইয়োরিটি দেয়া৷ গেস্টকে হ্যাপি করতে গিয়ে নিজের সর্বোচ্চ দিতে গিয়ে অসুস্থ না হয়ে যাওয়া৷ এটাই! দেখা যাক, নিজে কতটা মেইনটেইন করতে পারি!